Friday, July 23, 2010

সবুজের অন্ধকারে পা...

অপলা এখনও দুয়ার ছাড়ে নাই।
কনে দেখা আলোর শেষাংশ তাহার বিবস্ত্র আঁচলখানিতে লুটাইয়া পড়িয়াছে। কী যে এক আজন্ম অন্তহীন ভাবনা তাহার হেজে পঁচে যাওয়া মনে খেলা করিয়া যায়, মুখাবয়বে তাহা ঠাহর হয়না। মন্ডলের পো আজও ঠ্যাঙ্গাইয়া গেছে। এমন প্রতিদিনই যায়। অতি তুচ্ছাতি তুচ্ছ কারণে রাগ তাহার নাকের ডগায় আসিয়া ভর করে, তাই শেষপর্যন্ত কোনোও আর্থিক সংস্থানই আর চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করিতে পারে না।

দুরের দিগন্ত আজকের মতো সূয্যিদেবকে শেষ আভূমি প্রণাম জানাইতেছে। এইবার অপলাকে বুঝি উঠিতে হয়। ঘরে সাঁঝবাতি দিবার বাহুল্যতা সে করিতে পারে না বটে কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় গৃহদেবতার সন্তুষ্টি বিধানে অবহেলা করিতেও দেখা যায় না। ঈশ্বর তাহাদের ছাড়িয়া দিতে পারেন, তাহারা অবলা- অবুঝ মহাপাতক, কী করিয়া ছাড়ে তাঁহাকে! অতএব অপলাকে উঠিতে হয়।

ধীরপায়ে নিঃশব্দে নিঃসংকোচে কিছু অন্ধকারও ত্রস্তে পা বাড়ায়। আশ্রয় খুঁজে নেয় ঘরের কোনাকানচিতে। ক্ষনিক পর চোখ সয়ে এলে বোঝা যায়, ভদ্দরলোকের ঘরে গেলে অপলাকে বুঝি সুনিপনা, সুলক্ষনা বলাই যেতো। হইতে পারে তাহাদের সম্বল বলিতে এই কয়টা হাঁড়ি-কুড়ি, তেল চিটচিটে বিছানা-বালিশ, মটকা, এক দুইটা সিড়কা ঝুলিতেছে হেথায় হোথায়,। তবুও তাহা বড়ো সযত্নে যথাস্থানে রহিয়াছে বলিতে পারিনা ঠিক কবে হইতে এইগুলি প্রতিক্ষা করিয়া আছে, উহাদের উদরেও জমা হইবে চাল, গুড়, শুটকি, চাইবা আরও কতোকিছু। মটকার তলানী থেকে শেষ দুই মুঠ চাল শীর্ণহাতখানিতে উঠিয়া আসে। পলমাত্র দৃষ্টি আটকাইয়া থাকে। কালরাত্রি থেকে পেটে তেমন কিছু পড়ে নাই। তবুও এই যক্ষের ধন সে আগলাইয়াছে মন্ডল পো'র জন্য। আহা! মানুষটা ভাত খাইতে বড়ো ভালোবাসে। গরম ধোয়া উঠা ভাতে পানি ঢালিয়া কচু শাক মাখাইয়া যখন গো-গ্রাসে গিলিতে থাকে, তখন অপলার মুখ গহ্বরের সাথে চোখও সিক্ত হইয়া আসে। ভুলিয়া যায় পিঠের ব্যাথা, খালি পেটে উগরে আসা ঢাকের শব্দ চাপা পড়িয়া যাইতে থাকে শুরুর দিনগুলোর সুখচ্ছবিতে। মানুষটা যখন তাহাকে কাছে টানিত হাড়-মাংস যেন গলিয়া একাকার হইতে চাহিতো।

ছাতিম গাছের উপরে জন্ডিসের রোগীর মতো দেখিতে চাঁদখানি হাঁপাইতেছে। আর দেরি করিলে চলে না। সালেহা দাঁড়াইয়া থাকিবে, বুড়ো অশ্বথ গাছটার নিচে। অতোরাতে ও পথে কেউ পা বাড়ায় না। কোনো এক মন উথাল-পাথাল করা চান্নিরাতে শেখের ভরা যুবতী মেয়ে কলমি ঝুলে পড়ে কোনো এক অশ্বথ এর ডালে। অভিমানে না অনুতাপে, কে তাহার খবর রাখে! লোকে বলে, অশ্বথের ঝুড়িগুলি যেন কলমি'র ঝাঁকড়া চুল!

গায়ে একটু জল না ঢাললেই নয়। দুধের সরের মতো অন্ধকার ভাসিতেছে কুয়ার পাড় জুড়িয়া। লোহার জং-ধরা বালতি ঝাঁপাইয়া তমসা'র জলে। উঠিয়া আনিতে প্রাচীন পাথরে গোঁত্তা খাইয়া চাপা আর্তনাদ করিয়া উঠে। উর্ধ্বাঙ্গে একখানি ন্যাকড়া জড়াইয়া সমস্ত তাপিত যন্ত্রনা শীতল জলে ভাসাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করে অপলা।

নিভুজ্বালে ভাত হইয়া আসিয়াছে। আতঃপর পিছনের জংলা থেকে তুলিয়া আনা কচুশাকগুলিও চাপিয়ে দেয়। একটু নুনে সিদ্ধ করিয়া নেয়া, আর কী! উনুনের সোনালীছটা ঝাপটায় অপলার জীর্ণ শরীরে। এতক্ষনে যেন বা তাহারে ভালো করিয়া দেখা যায়। খড়িউঠা চামড়ার নিচে এখনো সাক্ষ্য দেয় এখানে ভরা বর্ষা নামিয়া ছিলো একদিন। অপলা বড়ো সাজিতে ভালোবাসিতো। ঘরের কোনো ঘুপচিতে খুঁজলে এখনো হয়তোবা পাওয়া যাইতে পারে তাহার শাদা হয়ে যাওয়া ধূসর লাল ফিতে, সর্ষের তেলে বানানো কাজল। উঁচু হয়ে উঠা হনুর একটু উপরে যেই খানে এখন আগুনের ফুলকি লাফিয়া লাফিয়া উঠিতেছে, সেইখানে কোনো এক সহস্রযুগ পুর্বে গ্রীষ্মের শান্ত দুপুর স্থির হইয়া থাকিতো। সে বহু আগের কথা। অপলা সাজিতে বড়ো ভালবাসিতো!

সব হইয়া গেলে জল ছড়াইয়া কয়লার চাপা আগুন নিভাইয়া ফেলে। খাবার পরিপাটি করিয়া সাজাইয়া রাখে ঘরের এক কোনে। মন্ডলের পো কখন ফিরে তাহার নাই কোনো ঠিক। পরনের কয়েক তালি দেওয়া শাড়িটাই আবার একটু গোছাইয়া নেয়। ভেজা চুলেই করে নেয় হাতখোঁপা। ছোঁয়াইবে না ছোঁয়াইবে করিয়াও একটু খানি বুলিয়া নেয় সিঁদুর। ক্ষয়াটে আলোয় আরেকবার চোখ বুলায় চারপাশে। প্লাস্টিকের সস্তা শাঁখা ঠোকাঠুকি খায়।

অপলা রাস্তায় নামে। বড়ো পিচ্ছিল বৃষ্টির জলে। রাত্রি তাহার পিছনে হাঁপানী রোগীর মতো শ্বাস টানে। অপলা পা দুটি টানিয়া লইয়া যায় আলপথ ধরিয়া। একসময় হারিয়ে যায় ওই সবুজের অন্ধকারে।

1 comment:

  1. ভাল লেখা, উপমার প্রাচুর্য ভাল লেগেছে, শেয়ার এ দিলাম ।

    ReplyDelete