Friday, July 23, 2010

পুরানো সেই দিনের কথা

শীতের পড়ন্ত দুপুরে কুসুম আলোয় চারদিকে কেমন একটা ওম ভাব।পিঠে নরম আদুরে রোদ মাখিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময়।গন্তব্য একটাই-নানাবাড়ি, বেশি দূর তো নয়!নানাবাড়ির টিনের গেট, পুরানো দেয়ালের অলিগলি দিয়ে মাধবীলতাগুলোর ঠেলাঠেলি দেখে যখন ভাবছি, পাপড়িগুলি নখে লাগিয়ে খালাদের তাক লাগিয়ে দিব-তখনই মেঝ মামা এসে গেট খুলে দিলেন। বাড়ির প্রধান অংশে ঢুকতে হলে আগে মেঝ মামার ঘরটাই পরে।তাই কেউ এলে গেট খোলার দায়িত্ব তাঁর উপরই পরে। আমার মা যথারীতি আমার অস্তিত্ব বেমালুম ভুলে গিয়ে অন্দর মহলে অদৃশ্য হলেন। কিন্তু আমার ছাড়পত্র এত সহজে মিলে না।পিছু পিছু গেলাম মামার ঘরে। বাক্স-পেটরা, খাটের নীচ ঘেঁটে অবশেষে ইয়া মোটা এক বই বের করলেন। নিজেই এক চেয়ার টেনে নিয়ে উঠানে এমন ভাবে বসিয়ে দিলেন যেন আমার পিঠটা থাকে সবার দিকে আর সামনে সীমানা ঘেরা দেয়াল। ঘাড়ের পেছনে মাথার ওপর নির্দেশ ভেসে আসে-এতগুলো পৃষ্ঠা পড়ে বুঝিয়ে বলতে হবে কী বুঝলাম! কিন্তু কী পড়ছি কিছুইতো মাথায় ঢুকছেনা! কালিগুলি লেপটে যাচ্ছে, অক্ষরগুলো ট্রেনের বগির মতো ছুটে ছুটে যাচ্ছে। পিছনে মা-খালা-মামী’র কুঁ ঝিক ঝিক আওয়াজ!মামী কথার ফুরসতে অসহায়ের সহায় হতে চেষ্টা করেন-‘কেন রে বাবা বাচ্চাটাকে এত চাপ দেয়া?নানীরবাড়িতে কই একটু আনন্দ করবে?’ আমার মা টিমটিমে জ্বলে উঠা প্রদীপে নিমিষেই পানি ঢেলে দেন-‘সারাদিনতো এপাড়া-ওপাড়া! এবার একটু পড়াশোনা করুক!’ যাইহোক রিডিং-এ স্বাভাবিক দক্ষতা থাকার কারনে নির্যাতন সেল থেকে বের হতে বেশি সময় লাগে না।এভাবেই কাটতো আমার নানাবাড়ির শীতের দুপুরগুলো কিন্তু কী পড়েছি, লেখকের নাম কী-কিছুই মনে নেই।আজও মনে করতে পারিনা! তবে মনে আছে আমার গুপ্তধন আবিষ্কারগুলোর কথা।

আমার প্রিয় অভ্যাসগুলির একটি হচ্ছে বাড়ির পুরানো দেরাজ, ট্রাঙ্ক, আলমারি ঘাঁটাঘাঁটি।মূল্যবান কিছুর সন্ধান নয়, ভ্যাপসা মেটমেটে গন্ধে চলে যেতাম মুমূর্ষ দুপরটাকে পেছনে রেখে বহুদূরে, যখন আমার জন্মই হয়নি হয়তবা! এমনি এক সময়ে ছোট মামার ঘরের কোণের কালো চকচকে সিন্ধুকটা হাতছানি দিতে থাকে। মামীর কাছে চাবি নিয়ে দে ছুট! ডালা খুলে নিজের হাত-পা কামড়াতে ইচ্ছা করে! এর সন্ধান আমি এতদিন কেন করিনি! ভিতরে রাশি রাশি বই। পরে শুনেছি ওগুলো আমার মা আর বড় মামা’র সম্পদ। আমার মা আমার ঐ বয়সে যা পড়ে রোমাঞ্চিত হতেন, আমিও হয়েছি কতবার! গল্প, লেখা নাকি সময়-কী কারন তা জানিনা! তবে ওই আমার প্রথম বড় আবিষ্কার।

আমাদের পাড়ার মিলি ঠিক আট-দশটা ছেলে মেয়ের মত নয়। বয়সে আমাদের কিছু বড়ই হবে হয়তবা। কৃষ্ণ বর্ণ শরীরে চোখগুলি বড় বেশি উজ্জ্বল। কালো ঘন চুলের স্রোত কোমর ছাপিয়ে উদ্দাম বেগে চলছে। মা নেই, চলে গেছে অন্যলোকের ঘর করতে। সারাদিন সারা পাড়া দাবড়িয়ে বেড়ায়।কখনো কামরাঙ্গা গাছে, কখনো কে কত উঁচু থেকে পুকুরে লাফ দিয়ে পড়তে পারে সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কখন হাসে, কখন রাগে-কোন মাথামুন্ডু নেই। আমরা বাচ্চার দল সমঝে চলি মিলিকে। একদিন তার হাতে দেখা গেল রঙ্গিন মলাটে পরীর ছবি আঁকা বই। বই এর কথা জিজ্ঞেস করতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল অন্যগল্পে। মিলি’র মতে পরী সত্যি আছে! ও তাদের দেখতে পায়। আমাদের বাড়ির পাশেই চাচার বাড়ি।বাড়ির সামনে বিশাল সাদা অর্জুন মাথা উঁচিয়ে আছে। মিলির দাবী, ঐ গাছেই রাত গভীরে দুটি পরী নামে। এছাড়া ওর কাছে দুটো সাদা ঝিনুক আছে। মধ্যরাতে গাছের নীচে গিয়ে সাদা দূটো ঝিনুক ঘষলেই পরীদের দেখতে পাওয়া যায়। এই যে ও নানারঙ্গের পুঁতির মালা, কানের দুল পড়ে, এগুলোতো ওদেরই দেয়া! আমি এই অতি রোমাঞ্ছকর গল্প অবিশ্বাস করার কোন কারণই খুঁজে পেলাম না। সাথে সাথে ঠিক করে ফেললাম দুজনে আজ রাতেই অভিযানে যাব। অবশ্য সেই ‘আজ রাত’ আর কখনোই আসেনি। তবে একমাত্র বিশ্বাস স্থাপনকারী হিসেবে দেশীয় রূপকথা ছাড়াও নানান দেশীবিদেশী রূপকথার বইগুলি দলের মধ্যে আমাকেই একমাত্র পড়তে দেয়া হতো!

বান্ধবীর সাথে কথা বলছিলাম কলেজে ভর্তির ব্যাপারে। বিদায় নিয়ে আসার সময় পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে একজন মুচকি হেসে ডাক দিল-‘তোমার নাম কি অমুক? কীসে পড়ো?’ নতুন ব্যাক্তিত্ব জাগতে শুরু করেছে সদ্য। তাই অপরিচিত কন্ঠে ‘তুমি’ সম্বোধন এবং অকারণ হাসি চামড়ার পিন ফোটালো। গলা যথাসম্ভব ভারী করে জবাব দিলাম-‘হুম, আমি অমুক। এই বিভাগে পড়ি।’ ঐ শুরু আমাদের বন্ধুত্বের। জানলাম, পাড়ায় নতুন এসেছে এবং অল্পদিনে এও জানতে পারলাম আমাদের পাড়ার সবাইকে ও আমার চেয়ে ভালো চেনে। এমন অনেক বাড়ি আছে যেখানে আমি একপাড়াতে থেকেও কখনো যাইনি, শুধু বাইরে থেকে দেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করেছি ভিতরটা কেমন হতে পারে-এরকম অনেক বাড়ির সাথে ইতোমধ্যে তাঁর ভালো জানাশোনা হয়ে গেছে। প্রধান সড়কের পাশের পুরানো বাড়িটাতে ওঁর সুবাদেই প্রবেশাধিকার পাই। ছোটবেলা থেকেই তো দেখে আসছি বাড়িটা! বাইরে থেকে দেখে বোঝার একদম উপায় নেই ভেতরটা এত্ত বড়। প্রথমে ঢুকেই আমার মনে হলো শরতচন্দ্রের কোন বই এর ভেতরে ঢুকে গেছি বোধহয় কোনভাবে। ঢুকতেই বিশাল টানা হলঘর। সারা ঘরের দেয়ালজুড়ে সারি সারি কাঠের আলমারি ভর্তি বই। মেঝেতে বই, দুটো বড় গোল টেবিল জুড়ে বই, বিছানায় বই, কোথায় নেই বই! এই ঘর পার হলে সারি সারি আরো কতগুলো ঘর আছে, ওগুলোও বড় তবে প্রথমটার মত নয়। পাশে টানা লম্বা বারান্দা। ঊঠোন পেড়িয়ে পাকশালা, কলের পাড় এবং অনেকগুলি সিঁড়ি টপকিয়ে শৌচাগার। বাড়িতেও লোকসমাগম নেই। বইয়ের পাঠক এবং সংগ্রহকারী নিজে, জননী এবং কন্যা। বই ছাড়া দামী কিংবা মূল্যবান আর কিছুই চোখে পড়েনি। বাড়িটা এবং সারি সারি বইয়ের স্তুপগুলি এখনও আমার মনে পড়ে। অরিজিনাল মলাটে, সমগ্র বা সবখন্ডসহ যেকোন বই ওই হলরুমটিতে ছিল। যতবার গেছি সবগুলি আলমারি, টেবিলে, মেঝের বইগুলি ঘুরে ঘুরে দেখতাম। গন্ধ শুঁকে বেড়াতাম।

আমার আরেকটি সেরা আবিষ্কার!

No comments:

Post a Comment