গত পরশুরাতে এক ঝাঁক তেলাপোকা আচমকাই আমার বিছানায় উড়ে এসে জুড়ে বসলো। এখানের ফোঁড়, ওখানের জংধরা সেফটিপিনের দূর্বল বাঁধ- সূক্ষ জাল মশারিকে নিশ্ছিদ্র করার ব্যর্থ প্রয়াস- আমার ঘরের সমস্ত কীটপতঙ্গের কাছে ক্রীতদাসের হাসির মতো। এই শ্রেনীর ভাষ্য অনুসারে আমি নাকি তাদের দারুনভাবে attract করি (খোদাই মালুম তা কিভাবে!)। তাই শুকনো খটখটে রাস্তায় এক কদম পিছিয়ে দু’কদম এগোলেই আমার জন্য কোনো কেঁচো ওৎ পেতে থাকবেই। একবিন্দু পরিমান লাল পিপড়েগুলি খেলতে খেলতে ঠিক আমার চোখের মনিতেই পড়বে। আর বেচারা আমি খেলায় বিঘ্ন দানকারী হিসেবে কুট্টুস কুট্টুস কামড় খেয়ে চোখ লাল করে ঘুরে বেড়াই।
আর ধরুন মশাই মশা। সমস্ত মশককূলের কাছে আমি নম্রুদের ছোটভাই। তাদের প্রতিনিধিরা প্রায়ই চেষ্টা করে আমার মুখগহবর দিয়ে ঢুকে নাসিকার ছিদ্র পথে বের হতে। আমার সাথে তাদের প্রিয় খেলা ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ’, ভোঁ ভোঁ দৌড়ে একবার ডানকানের ভেতর, কষে একটা থাপ্পড়ের শব্দে আবার বামকান- চলতে থাকে যতক্ষন না নিদ্রাদেবী দয়াপরবশত আমার শ্রান্তদেহ খানি তার বক্ষে টেনে নেয়।
কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি! সবই দোষ ভাই বয়সের দোষ! কথা বোঝাই মালগাড়ি আজকাল প্রায়ই দেখছি লাইন ছেড়ে খালি বে-লাইনে ছুটে যায়। একে তো জাইড়ার ট্রেন(লোকাল ট্রেন) তারপর যদি আবার কারও ঘাড়ে লাফিয়ে চড়ে- দেখেন্ত দেখি কেমন এক কান্ড হয়!
আহ! যা বলছিলাম! সেদিন রাত আনুমানিক দুই প্রহরে তেলাপোকার এক কমান্ডো বাহিনী তাদের শক্তিশালী পাখায় ভর করে আমার বিছানার বির বিক্রমে ল্যান্ড করে। সুশৃংখলভাবে সুস্থির হবার পর মাঝারী সাইজের গাট্টাগোট্টা একজন পেছনের আলখাল্লা দোলাতে দোলাতে গুটিগুটি পায়ে আমার নাকের ডগায় চেপে বসলো। (মাঝরাতে এ কী যন্ত্রণা!) বুড়ো ভাম দেখি আবার গলা পরিষ্কার করছে! মানুষের সাথে ঘর সংসার করতে করতে লেকচার ঝাড়ার প্রক্রিয়াও রপ্ত করে ফেলেছে নাকি! এই লেকচারের হাত থেকে আমি শেষ পর্যন্ত তেলাপোকার হাত থেকেও রেহাই পাবো না! অদ্ভুত কোনো কারনে সকল সময় সকল পদের মানুষ সেচ্ছাসেবক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে লেকচারের সহিত আমার মানসচক্ষু উন্মোচন করতে সদা ব্যস্ত। ‘এই শোন, এই শোনেন- তুমি কি আপনি কি এটা জানেন? বিষয়টা হচ্ছে এরকম যে, টিক-টিক-টিক... ।‘
হেথা হতে হোথা যাই, পুনর্বার পথ হারাই। তেলিনেতা’র (তেলাপোকাদের দলনেতা) সূচনাপর্বের সারমর্ম হচ্ছে উনারা তেলিদের (তেলাপোকাদের) বিষয়ে আমাকে মূল্যবান জ্ঞান্দান করতে চান। আমাকে এই বিশেষ সম্মান দানের কারন আর কিছুই না- তারা আমাকে পর্যবেক্ষন করে দেখেছে আমি অত্যন্ত আদর্শ একজন শ্রোতা। প্রয়োজনীয় discourse marker জায়গামতো সেট করে দিয়ে বক্তার বক্তব্য KTX(electric train) গতিতে চালিয়ে নিতে পূর্ণ সহযোগিতা করি।
বক্তব্য’র মাঝখানে বিটকেলে প্রশ্ন খাম্বার মতো গেঁড়ে দেই না। বা মান্দারের কাঁটা দিয়ে যুক্তির প্রাচির গড়ার অযথা চেষ্টা করি না। একজন সুচিন্তিত ব্যাক্তি (তেলিনেতার বক্তব্য অনুসারে) হিসেবে বক্তার বক্তব্যের সাথে আমি সবসময়ই ১০০% সহমত পোষন করি।
তাই তেলিরা একজন সহানুভূতি সম্পন্ন (তেলিনেতার মতে) শ্রোতার কাছে এসেছে তাদের কিছু মনোবেদনা জানাতে এবং তেলিসমাত্যের উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে। তাঁর ভাষাতেই আমি বলি না কেন-
“তোমরা আমাদের কীটদের মধ্যে শুদ্রশ্রেনীর বলে গন্য করো। অথচ বর্নবাদ ইস্যুতে ঠিকই গলা ফাটাও। মানুষের প্রাণ আছে বলে সে প্রাণী আমরা সাইজে যতো ছোটই হই না কেন প্রাণতো আমাদেরও আছে। আর প্রাণের পরিমাপ যেহেতু করা সম্ভব না, আতি আমাদের হেও করাও যুক্তিযুক্ত না। আমরা দুই গোত্রই যেহেতু প্রাণী সেহেতু প্রাণী অধিকার আমাদের সমান হওয়া উচিত। সেই অধিকার থেকে আমাদের সম্পূর্ণ রূপে বঞ্চিত করেই কেবল তমরা ক্ষান্ত হওনি বরং নিত্যনতুন insect killer- এর বিজ্ঞাপনে বাজার ভর্তি করে জান্তব ধংসযজ্ঞে নেমেছো। আত্মসম্মানবোধ এখনো অবশিষ্ট আছে বলে কুকুরের মতো বিশ্বস্ত প্রভুভক্ত এখনও হতে পারিনি হয়তো, তাই বলে ইঁদুর, মশামাছির মতো মহামারিওতো ঘটাই নি কখনো। (একটু থেমে)
তোমাদের ভয়ে আজ আমরা নির্বাসিত নিশাচর, অন্ধকারের পুজারী। মনুষ্যশ্রেনীতে নারিকূল আরো কয়েককাঠি বাড়া! কোনো ভদ্র তেলিলোক এদের সামনে পড়লে গরুর মতো চোখ দুটি বের করে দিয়ে ষাড়ের মতো চিল্লায়। এই হীন আচরন প্রতিনিয়ত যেন আমাদের আত্মমর্যাদার চাদর সোনামুখি সুঁই দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করছে। আর শিশুদিগের কথা কি বলবো! আমাদের দেখলেই শয়তানও তাদের পেছনে আঁঠার মতো সেঁটে যায়। একজনকে বাগে পেলেই উলটা করে ঝুলিয়ে দেয় কিম্বা আমাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করে- সেটা হলো চিত করে মাটিতে পেড়ে ফেলে। শূন্যে চার হাত-পা ছূড়েও মুক্তি মেলে না। এ কী বর্বর অকথ্য অত্যাচার নয় আমাদের উপর! আমাদের দাত নেই যে কামড়াবো, ধারাল নখ নেই যে থাবা বসাবো, কোনো শব্দ নেই যে ভনভন করে কানে জ্বালা ধরাবো, কোনো হুল নেই যা দিয়ে রক্ত টেনে নেবো, তবে কেন এত আক্রোশ আমাদের প্রতি!
প্রায়ই ডায়লগ ছাড়ো- ‘অতিকায় হস্তী লুপ্ত হইয়াছে তেলাপোকা টিকিয়া আছে’ একবার কি ভেবে দেখেছ কেন আমরা এখনো টিকে আছি? নিজেদের চারপাশে ভালো করে অবলোকন করো- বোকারাই দুঃসাহসী হয় আর অকারনে অযোক্তিক ভাবে অসময়ে ভুল জায়গায় সাহস প্রদর্শন করে অকালে বেঘোরে পটল তোলে- অতিকায় হস্তির কথা বলতে গিয়ে ‘সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট’ থিওরি’র কথা কিন্তু বেমালুম চেপে যাও। নিজেদের দিকে একবার তাকাও দেখি। পরিবার থেকে রাষ্ট্র- প্রাণের শুরু থেকে বিলীন হওয়া পর্যন্ত শুধু টিকে থাকার সংগ্রাম। বন্ধুদের আড্ডা থেকে অফিসের মিটিং- এই আমি আছি, টিকে আছি, আমারও অস্তিত্ব আছে- এই জানান দিতে দিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। নিজেদের মহাপ্রস্থান সযত্নে লালন করো- তুমি টিকে ছিলে এই চিহ্নটুকুর ছাপ অন্ততঃ যেন থাকে। বিবর্তনবাদের প্রায় শুরু থেকেই আমরা টিকে আছি, কারন টিকে থাকার ক্ষমতা আমাদের আছে, আর এই অস্তিত্ব, হোক না তোমাদের কাছে যতো হেয়, টিকিয়ে রাখাটাই প্রাণের সারকথা। ”
ফ্রাঞ্জ কাফকা’র ‘The Metamorphosis’ গলাধকরন করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। আমার দুর্বল পরিপাকতন্ত্র তা সহ্য করতে না পেরে গ্যাস দিয়ে বোঝাই করে ফেলেছে জায়গাটা। আমি নিশ্চিত এইসব নিছক এই গ্যাসেরই কারসাজি!
No comments:
Post a Comment