Friday, July 23, 2010

পুরানো সেই দিনের কথা

শীতের পড়ন্ত দুপুরে কুসুম আলোয় চারদিকে কেমন একটা ওম ভাব।পিঠে নরম আদুরে রোদ মাখিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময়।গন্তব্য একটাই-নানাবাড়ি, বেশি দূর তো নয়!নানাবাড়ির টিনের গেট, পুরানো দেয়ালের অলিগলি দিয়ে মাধবীলতাগুলোর ঠেলাঠেলি দেখে যখন ভাবছি, পাপড়িগুলি নখে লাগিয়ে খালাদের তাক লাগিয়ে দিব-তখনই মেঝ মামা এসে গেট খুলে দিলেন। বাড়ির প্রধান অংশে ঢুকতে হলে আগে মেঝ মামার ঘরটাই পরে।তাই কেউ এলে গেট খোলার দায়িত্ব তাঁর উপরই পরে। আমার মা যথারীতি আমার অস্তিত্ব বেমালুম ভুলে গিয়ে অন্দর মহলে অদৃশ্য হলেন। কিন্তু আমার ছাড়পত্র এত সহজে মিলে না।পিছু পিছু গেলাম মামার ঘরে। বাক্স-পেটরা, খাটের নীচ ঘেঁটে অবশেষে ইয়া মোটা এক বই বের করলেন। নিজেই এক চেয়ার টেনে নিয়ে উঠানে এমন ভাবে বসিয়ে দিলেন যেন আমার পিঠটা থাকে সবার দিকে আর সামনে সীমানা ঘেরা দেয়াল। ঘাড়ের পেছনে মাথার ওপর নির্দেশ ভেসে আসে-এতগুলো পৃষ্ঠা পড়ে বুঝিয়ে বলতে হবে কী বুঝলাম! কিন্তু কী পড়ছি কিছুইতো মাথায় ঢুকছেনা! কালিগুলি লেপটে যাচ্ছে, অক্ষরগুলো ট্রেনের বগির মতো ছুটে ছুটে যাচ্ছে। পিছনে মা-খালা-মামী’র কুঁ ঝিক ঝিক আওয়াজ!মামী কথার ফুরসতে অসহায়ের সহায় হতে চেষ্টা করেন-‘কেন রে বাবা বাচ্চাটাকে এত চাপ দেয়া?নানীরবাড়িতে কই একটু আনন্দ করবে?’ আমার মা টিমটিমে জ্বলে উঠা প্রদীপে নিমিষেই পানি ঢেলে দেন-‘সারাদিনতো এপাড়া-ওপাড়া! এবার একটু পড়াশোনা করুক!’ যাইহোক রিডিং-এ স্বাভাবিক দক্ষতা থাকার কারনে নির্যাতন সেল থেকে বের হতে বেশি সময় লাগে না।এভাবেই কাটতো আমার নানাবাড়ির শীতের দুপুরগুলো কিন্তু কী পড়েছি, লেখকের নাম কী-কিছুই মনে নেই।আজও মনে করতে পারিনা! তবে মনে আছে আমার গুপ্তধন আবিষ্কারগুলোর কথা।

আমার প্রিয় অভ্যাসগুলির একটি হচ্ছে বাড়ির পুরানো দেরাজ, ট্রাঙ্ক, আলমারি ঘাঁটাঘাঁটি।মূল্যবান কিছুর সন্ধান নয়, ভ্যাপসা মেটমেটে গন্ধে চলে যেতাম মুমূর্ষ দুপরটাকে পেছনে রেখে বহুদূরে, যখন আমার জন্মই হয়নি হয়তবা! এমনি এক সময়ে ছোট মামার ঘরের কোণের কালো চকচকে সিন্ধুকটা হাতছানি দিতে থাকে। মামীর কাছে চাবি নিয়ে দে ছুট! ডালা খুলে নিজের হাত-পা কামড়াতে ইচ্ছা করে! এর সন্ধান আমি এতদিন কেন করিনি! ভিতরে রাশি রাশি বই। পরে শুনেছি ওগুলো আমার মা আর বড় মামা’র সম্পদ। আমার মা আমার ঐ বয়সে যা পড়ে রোমাঞ্চিত হতেন, আমিও হয়েছি কতবার! গল্প, লেখা নাকি সময়-কী কারন তা জানিনা! তবে ওই আমার প্রথম বড় আবিষ্কার।

আমাদের পাড়ার মিলি ঠিক আট-দশটা ছেলে মেয়ের মত নয়। বয়সে আমাদের কিছু বড়ই হবে হয়তবা। কৃষ্ণ বর্ণ শরীরে চোখগুলি বড় বেশি উজ্জ্বল। কালো ঘন চুলের স্রোত কোমর ছাপিয়ে উদ্দাম বেগে চলছে। মা নেই, চলে গেছে অন্যলোকের ঘর করতে। সারাদিন সারা পাড়া দাবড়িয়ে বেড়ায়।কখনো কামরাঙ্গা গাছে, কখনো কে কত উঁচু থেকে পুকুরে লাফ দিয়ে পড়তে পারে সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কখন হাসে, কখন রাগে-কোন মাথামুন্ডু নেই। আমরা বাচ্চার দল সমঝে চলি মিলিকে। একদিন তার হাতে দেখা গেল রঙ্গিন মলাটে পরীর ছবি আঁকা বই। বই এর কথা জিজ্ঞেস করতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল অন্যগল্পে। মিলি’র মতে পরী সত্যি আছে! ও তাদের দেখতে পায়। আমাদের বাড়ির পাশেই চাচার বাড়ি।বাড়ির সামনে বিশাল সাদা অর্জুন মাথা উঁচিয়ে আছে। মিলির দাবী, ঐ গাছেই রাত গভীরে দুটি পরী নামে। এছাড়া ওর কাছে দুটো সাদা ঝিনুক আছে। মধ্যরাতে গাছের নীচে গিয়ে সাদা দূটো ঝিনুক ঘষলেই পরীদের দেখতে পাওয়া যায়। এই যে ও নানারঙ্গের পুঁতির মালা, কানের দুল পড়ে, এগুলোতো ওদেরই দেয়া! আমি এই অতি রোমাঞ্ছকর গল্প অবিশ্বাস করার কোন কারণই খুঁজে পেলাম না। সাথে সাথে ঠিক করে ফেললাম দুজনে আজ রাতেই অভিযানে যাব। অবশ্য সেই ‘আজ রাত’ আর কখনোই আসেনি। তবে একমাত্র বিশ্বাস স্থাপনকারী হিসেবে দেশীয় রূপকথা ছাড়াও নানান দেশীবিদেশী রূপকথার বইগুলি দলের মধ্যে আমাকেই একমাত্র পড়তে দেয়া হতো!

বান্ধবীর সাথে কথা বলছিলাম কলেজে ভর্তির ব্যাপারে। বিদায় নিয়ে আসার সময় পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে একজন মুচকি হেসে ডাক দিল-‘তোমার নাম কি অমুক? কীসে পড়ো?’ নতুন ব্যাক্তিত্ব জাগতে শুরু করেছে সদ্য। তাই অপরিচিত কন্ঠে ‘তুমি’ সম্বোধন এবং অকারণ হাসি চামড়ার পিন ফোটালো। গলা যথাসম্ভব ভারী করে জবাব দিলাম-‘হুম, আমি অমুক। এই বিভাগে পড়ি।’ ঐ শুরু আমাদের বন্ধুত্বের। জানলাম, পাড়ায় নতুন এসেছে এবং অল্পদিনে এও জানতে পারলাম আমাদের পাড়ার সবাইকে ও আমার চেয়ে ভালো চেনে। এমন অনেক বাড়ি আছে যেখানে আমি একপাড়াতে থেকেও কখনো যাইনি, শুধু বাইরে থেকে দেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করেছি ভিতরটা কেমন হতে পারে-এরকম অনেক বাড়ির সাথে ইতোমধ্যে তাঁর ভালো জানাশোনা হয়ে গেছে। প্রধান সড়কের পাশের পুরানো বাড়িটাতে ওঁর সুবাদেই প্রবেশাধিকার পাই। ছোটবেলা থেকেই তো দেখে আসছি বাড়িটা! বাইরে থেকে দেখে বোঝার একদম উপায় নেই ভেতরটা এত্ত বড়। প্রথমে ঢুকেই আমার মনে হলো শরতচন্দ্রের কোন বই এর ভেতরে ঢুকে গেছি বোধহয় কোনভাবে। ঢুকতেই বিশাল টানা হলঘর। সারা ঘরের দেয়ালজুড়ে সারি সারি কাঠের আলমারি ভর্তি বই। মেঝেতে বই, দুটো বড় গোল টেবিল জুড়ে বই, বিছানায় বই, কোথায় নেই বই! এই ঘর পার হলে সারি সারি আরো কতগুলো ঘর আছে, ওগুলোও বড় তবে প্রথমটার মত নয়। পাশে টানা লম্বা বারান্দা। ঊঠোন পেড়িয়ে পাকশালা, কলের পাড় এবং অনেকগুলি সিঁড়ি টপকিয়ে শৌচাগার। বাড়িতেও লোকসমাগম নেই। বইয়ের পাঠক এবং সংগ্রহকারী নিজে, জননী এবং কন্যা। বই ছাড়া দামী কিংবা মূল্যবান আর কিছুই চোখে পড়েনি। বাড়িটা এবং সারি সারি বইয়ের স্তুপগুলি এখনও আমার মনে পড়ে। অরিজিনাল মলাটে, সমগ্র বা সবখন্ডসহ যেকোন বই ওই হলরুমটিতে ছিল। যতবার গেছি সবগুলি আলমারি, টেবিলে, মেঝের বইগুলি ঘুরে ঘুরে দেখতাম। গন্ধ শুঁকে বেড়াতাম।

আমার আরেকটি সেরা আবিষ্কার!

ক্রুগো'র দোকান

ক্রুগো যখন দোকানের শেষ বাতি নিভাচ্ছে তখনো মেয়েটা রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে। কী দেখে অমন মনোযোগ দিয়ে!ডিসপ্লেতে সাজানো বাহারি ব্যাগ? নাকি বুড়ির হাতের মতোই ফেটে যাওয়া মরাটে রুগ্ন ডালিমগুলো? গত পরশুও এসেছিল সে। সোনালু চামড়ার নীচ থেকে রক্ত সরে গেছে আরও। সন্ধ্যার বিষণ্ণতা পসরা সাজিয়েছে দু’চোখে।

সাহায্যকারী ছেলেটি জানিয়ে গিয়েছিলো নতুন কাস্টমারের কথা। কিন্তু সাথে সাথেই ক্রুগোর উঠে আসার উপায় ছিলোনা। বুড়ো ভুহাই তখনো হাতটা ধরেছিলো ওর। বুড়োর টাকার অভাব ছিলোনা, অভাব ছিলো তা ভোগ করার মতো লোকের। তবুও কোনদিন কেউ দু’পয়সার সাহায্য পায়নি, তাই কেউ কাছেও ঘেঁষেনি। শেষবেলাতেও বুড়োর কিপ্টেমি যায়নি, দাম নিয়ে মূলো ঝুলোঝুলি করেছে অনেকক্ষণ। শেষে ১৫০ রুক্তিতে দফা!


দরজা ঠেলে কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালে মেয়েটা ক্যাটালগ থেকে মুখ তুলে। ‘তোমাদের এখানে প্রতিটি পদ্ধতির অনেক দাম লিখে রেখেছ! অথচ রুগুলকের দোকানে সবগুলির দাম কিন্তু প্রায় অর্ধেক!’ শব্দগুলি যেন বাতাসের গায়েও শিরশিরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ক্রুগোর কানে তাই একটু দেরীতে পৌঁছায়। ‘তাহলে সেই কসাইটার কাছেই যাচ্ছোনা কেন?’ বলতে গিয়েও গিলে ফেলে। কাস্টমারকে সব কথা বলতে নেই। রুগুলক যেন তেন করে কাজ সারে তা সবাই জানে। অথচ ক্রুগো সবচেয়ে কম যন্ত্রনা যেন হয় সেদিক দিয়ে সচেষ্ট থাকা থেকে শুরু করে, যথাস্থানে তা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত করে। এমনকি সে নিজের হাতে সবকিছু করে, কাস্টমার চাইলে শেষ সময় উপস্থিত থাকে। তবুও লোকের অভিযোগের কমতি নেই!

মেয়েটি আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ক্যাটালগ দেখে। অবশেষে নলখাগড়ার মতো তর্জনীটা সবচেয়ে দামী এবং সহজ পদ্ধতির উপর প্রতিস্থাপিত হয়।
‘আমি যদি এটা বেছে নেই, বলতে পারো কতক্ষণ লাগবে সবকিছু শেষ হতে?’
‘দুই মিনিট ষোল সেকেন্ড।‘
‘তুমি কি ঘড়ি হাতে নিয়ে বসে দেখেছিলে?’
মেয়েটা কি কৌতুক করছে? পেশাগত অভিজ্ঞতার কোন দাম নেই! ক্রুগো এইবার কিছুটা চিবিয়ে জবাব দেয়-
‘শেষ মূহুর্তে যদি তোমার দৃঢ় চিত্ত চির খায়, সেক্ষেত্রে কিছু সময় বেশি লাগবে।‘
‘এটা নিয়ে তোমার চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু তুমি কি অন্তত কিছুটা দাম কমাতে পারো না?’
ক্রুগো এইবার বেশ বিরক্ত হয়। এরা সবাই ভাবেটা কী! এটা কি কোন দাতব্যলয় যেখানে বিনামুল্যে সেবা প্রদান করা হবে!
‘এতে যদি তোমার পোষায় তাহলে সবকিছু দ্রুত এবং সহজভাবে করার ব্যবস্থা করতে পারি। নইলে তুমি রুগুলকের দোকানে যেতে পারো। আশা করি তোমার বাজেট অনুযায়ী সেটাই উত্তম হবে।‘
‘তুমি একটু চিন্তা করে দেখ। আমি কাল আবার আসবো।‘
মেয়েটি ভারী আশ্চর্য! মাথাব্যথা কি আমার! ক্রুগো মুখ শক্ত করে মেয়েটির চলে যাওয়া দেখে। দেখো, এমনভাবে পা ফেলছে যেন মাটিতে ধূলোবালিগুলো ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠবে!


আসেনি মেয়েটি গতকাল। কোন কারনে ক্রুগো সারাদিন মেয়েটির অপেক্ষায় ছিল। অবশ্য শক্তচোয়াল আর ঘন ভ্রু এর নীচে সাদা বোতামের মতো চোখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই।

দোকানে ঝাঁপিটা ফেলার পরও মেয়েটা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।ল্যাম্প পোস্টের ম্যারম্যারে হলুদ আলোয় মেয়েটাকে আরও ক্ষয়াটে মনে হয়। এবার ক্রুগোর দোকানের দিকেই মুখ করা। দোকানের সাইনবোর্ডটি লাল সবুজ আলোয় বার বার পড়েই যাচ্ছে-
‘ ডেথ সপ। স্বল্পক্ষণে এবং সহজতম উপায়ে আপনার জীবনাবসান ঘটানোর একমাত্র বিশ্বস্তকর সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান ‘

ক্রুগো অস্বস্তি নিয়ে ভাবে, একবার কি গিয়ে বলা যায় ‘ আচ্ছা, ৫ রুক্তি না হয় কম দিও’ ?

গাধা সমাচার

গাধাটা অনেকক্ষণ যাবত নাকের সামনে মাছি দুইটি তাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। জীবন দর্শন বিষয়ক গভীর চিন্তা যা কিনা তার অপরাহ্নকালীন প্রিয় বিষয় তাতে কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছেনা। এমনসময় রামছাগলের তিন নম্বর বাচ্চাটা চার ঠ্যাংযে লাফাতে লাফাতে অর্ধেক হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিল-বুনো হাঁসের ছানাগুলি মিসিং।তাদের কোন ট্রেস পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে আলামত যা পাওয়া গেছে, মানে কাদামাটিতে গভীর পদচিহ্ন, তা শিয়াল না বেজী’র –তা এখনই নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই।
সাম্প্রতিক নিখোঁজ সংবাদ নাকি জীবন দর্শন কোন চিন্তায় বুঁদ হলে ভাবনার ফেনাবেগ সোনালী শিথিল দুপুরটাকে বেশি ফেনায়িত করবে-এটা নিয়ে যখন সে যথেষ্ট চিন্তিত, ঠিক সেই সময় ত্যাঁদর বেড়ালটা এসে বলল-একটু পর জরুরী মিটিং বসবে। সবার সরব উপস্থিতি জন্য আহ্বান করা হয়েছে।




কেউ খুর দাপিয়ে, কেউ লেজ দুলিয়ে আবার কেউবা ডানে বামে হেলতে দুলতে এসে সুবিধামত আসন নিয়ে বসল। পরিবেশ শান্ত হলে সিংহ উঠে দাঁড়ালেন।
“ভাইসব, আমি অত্যন্ত শোকবিহ্বল। আমি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জ়ানাই। একজন মাংসাশী প্রানী হিসেবে আমি নিজেও লজ্জিত এই বর্বর ঘটনায়...।“ এই দীর্ঘ প্যাঁচালের উপক্রমনিকা বাঘের সহ্য হলোনা।
“ঘটনা কী এবং তাঁর কার্য-কারণ না জানিয়াই আবেগে উদ্বেলিত হইবার মতো কোন কারন আমি খুঁজইয়া পাইতেছিনা। শিয়াল বা বেজী’র পেটে খোঁজ করিবার আগে আমাদের দেখিতে হইবে বাচ্চাগুলি আসলেই চুরি গিয়াছে কি না।“
শূয়োর ঘোঁত ঘোঁত করে উঠলো। “ ইডা তুমি কিতা কইলা! দুইপাইয়্যা জন্তুগুইলাইন আমাগো মুখের গেরাস কাইড়্যা লইয়্যা যায় গিইয়্যা। শিয়াল বেজী জীবন হাতে লইয়্যা অগো কাছ থই লই আয়ে। ওরা কয় মুরগী চোর শিয়াল। তুমিও কি বদমাইশগুলাইনের সাথে গলা মিলাইয়্যা নিজেগোর ভাই বেরাদররে চোর কইতে চাও?” অনেকগুলি ‘সহমত’ এবং ‘একমত’ এর গুঞ্জন উঠে চারপাশে।
ঘোড়ার খুর দাপানিতে তার স্পষ্ট অস্থিরতা প্রকাশ পায়। “Well, theft is the illegal taking of another person’s property without that person’s freely given consent. And I’m damn sure they didn’t take any permission from rightful authority”
ঊপরের মগডাল থেকে পেঁচা’র খসখসে আওয়াজ আসে-“ আমার কতাডা অইলো গিয়া তোমার প্রেম আর যুদ্ধে সবই সমান। প্যাডের যুদ্ধ বড় যুদ্ধ।“


গরু অনেক্ষণ জাবর কেটে যাচ্ছে। এবার তাকেও কিছু বলতে হয়। “I think আপনারা একটা বিষয় avoid করে যাচ্ছেন। আমাদের national branding নিয়ে ভাবতে হবে। ওরা অন্যকোথাও shelter নিলে, সেখানে আমাদের নিয়ে bad impression spread করতে পারে। যা কিনা আমাদের জাতীয়তাবাদের উপর হামলার সূচনা করতে পারে।I’m sure ছানাগুলি অন্যকোথাও খেলতে গেছে। so, please be careful যখন আপনারা কোন specific word use করছেন।“

গাধার চোখ ঢুলছে, হাই উঠছে সমান তালে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কেটে পরার সুযোগ খোঁজে। পিছিয়ে সরে আসতে আসতে শুনতে পায় রামছাগল মিহি সুরে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে মিসিং ছানাগুলি’র মা-কে-“ উনার জিনিস উনি নিয়্যা গ্যাছেন। হায়াত মওত সব হইলো উনার উপর”- বলে কোনদিকে আঙ্গুল দেখালো তা অন্ধকারে গাধাটার মালুম হলোনা।

সবুজের অন্ধকারে পা...

অপলা এখনও দুয়ার ছাড়ে নাই।
কনে দেখা আলোর শেষাংশ তাহার বিবস্ত্র আঁচলখানিতে লুটাইয়া পড়িয়াছে। কী যে এক আজন্ম অন্তহীন ভাবনা তাহার হেজে পঁচে যাওয়া মনে খেলা করিয়া যায়, মুখাবয়বে তাহা ঠাহর হয়না। মন্ডলের পো আজও ঠ্যাঙ্গাইয়া গেছে। এমন প্রতিদিনই যায়। অতি তুচ্ছাতি তুচ্ছ কারণে রাগ তাহার নাকের ডগায় আসিয়া ভর করে, তাই শেষপর্যন্ত কোনোও আর্থিক সংস্থানই আর চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করিতে পারে না।

দুরের দিগন্ত আজকের মতো সূয্যিদেবকে শেষ আভূমি প্রণাম জানাইতেছে। এইবার অপলাকে বুঝি উঠিতে হয়। ঘরে সাঁঝবাতি দিবার বাহুল্যতা সে করিতে পারে না বটে কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় গৃহদেবতার সন্তুষ্টি বিধানে অবহেলা করিতেও দেখা যায় না। ঈশ্বর তাহাদের ছাড়িয়া দিতে পারেন, তাহারা অবলা- অবুঝ মহাপাতক, কী করিয়া ছাড়ে তাঁহাকে! অতএব অপলাকে উঠিতে হয়।

ধীরপায়ে নিঃশব্দে নিঃসংকোচে কিছু অন্ধকারও ত্রস্তে পা বাড়ায়। আশ্রয় খুঁজে নেয় ঘরের কোনাকানচিতে। ক্ষনিক পর চোখ সয়ে এলে বোঝা যায়, ভদ্দরলোকের ঘরে গেলে অপলাকে বুঝি সুনিপনা, সুলক্ষনা বলাই যেতো। হইতে পারে তাহাদের সম্বল বলিতে এই কয়টা হাঁড়ি-কুড়ি, তেল চিটচিটে বিছানা-বালিশ, মটকা, এক দুইটা সিড়কা ঝুলিতেছে হেথায় হোথায়,। তবুও তাহা বড়ো সযত্নে যথাস্থানে রহিয়াছে বলিতে পারিনা ঠিক কবে হইতে এইগুলি প্রতিক্ষা করিয়া আছে, উহাদের উদরেও জমা হইবে চাল, গুড়, শুটকি, চাইবা আরও কতোকিছু। মটকার তলানী থেকে শেষ দুই মুঠ চাল শীর্ণহাতখানিতে উঠিয়া আসে। পলমাত্র দৃষ্টি আটকাইয়া থাকে। কালরাত্রি থেকে পেটে তেমন কিছু পড়ে নাই। তবুও এই যক্ষের ধন সে আগলাইয়াছে মন্ডল পো'র জন্য। আহা! মানুষটা ভাত খাইতে বড়ো ভালোবাসে। গরম ধোয়া উঠা ভাতে পানি ঢালিয়া কচু শাক মাখাইয়া যখন গো-গ্রাসে গিলিতে থাকে, তখন অপলার মুখ গহ্বরের সাথে চোখও সিক্ত হইয়া আসে। ভুলিয়া যায় পিঠের ব্যাথা, খালি পেটে উগরে আসা ঢাকের শব্দ চাপা পড়িয়া যাইতে থাকে শুরুর দিনগুলোর সুখচ্ছবিতে। মানুষটা যখন তাহাকে কাছে টানিত হাড়-মাংস যেন গলিয়া একাকার হইতে চাহিতো।

ছাতিম গাছের উপরে জন্ডিসের রোগীর মতো দেখিতে চাঁদখানি হাঁপাইতেছে। আর দেরি করিলে চলে না। সালেহা দাঁড়াইয়া থাকিবে, বুড়ো অশ্বথ গাছটার নিচে। অতোরাতে ও পথে কেউ পা বাড়ায় না। কোনো এক মন উথাল-পাথাল করা চান্নিরাতে শেখের ভরা যুবতী মেয়ে কলমি ঝুলে পড়ে কোনো এক অশ্বথ এর ডালে। অভিমানে না অনুতাপে, কে তাহার খবর রাখে! লোকে বলে, অশ্বথের ঝুড়িগুলি যেন কলমি'র ঝাঁকড়া চুল!

গায়ে একটু জল না ঢাললেই নয়। দুধের সরের মতো অন্ধকার ভাসিতেছে কুয়ার পাড় জুড়িয়া। লোহার জং-ধরা বালতি ঝাঁপাইয়া তমসা'র জলে। উঠিয়া আনিতে প্রাচীন পাথরে গোঁত্তা খাইয়া চাপা আর্তনাদ করিয়া উঠে। উর্ধ্বাঙ্গে একখানি ন্যাকড়া জড়াইয়া সমস্ত তাপিত যন্ত্রনা শীতল জলে ভাসাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করে অপলা।

নিভুজ্বালে ভাত হইয়া আসিয়াছে। আতঃপর পিছনের জংলা থেকে তুলিয়া আনা কচুশাকগুলিও চাপিয়ে দেয়। একটু নুনে সিদ্ধ করিয়া নেয়া, আর কী! উনুনের সোনালীছটা ঝাপটায় অপলার জীর্ণ শরীরে। এতক্ষনে যেন বা তাহারে ভালো করিয়া দেখা যায়। খড়িউঠা চামড়ার নিচে এখনো সাক্ষ্য দেয় এখানে ভরা বর্ষা নামিয়া ছিলো একদিন। অপলা বড়ো সাজিতে ভালোবাসিতো। ঘরের কোনো ঘুপচিতে খুঁজলে এখনো হয়তোবা পাওয়া যাইতে পারে তাহার শাদা হয়ে যাওয়া ধূসর লাল ফিতে, সর্ষের তেলে বানানো কাজল। উঁচু হয়ে উঠা হনুর একটু উপরে যেই খানে এখন আগুনের ফুলকি লাফিয়া লাফিয়া উঠিতেছে, সেইখানে কোনো এক সহস্রযুগ পুর্বে গ্রীষ্মের শান্ত দুপুর স্থির হইয়া থাকিতো। সে বহু আগের কথা। অপলা সাজিতে বড়ো ভালবাসিতো!

সব হইয়া গেলে জল ছড়াইয়া কয়লার চাপা আগুন নিভাইয়া ফেলে। খাবার পরিপাটি করিয়া সাজাইয়া রাখে ঘরের এক কোনে। মন্ডলের পো কখন ফিরে তাহার নাই কোনো ঠিক। পরনের কয়েক তালি দেওয়া শাড়িটাই আবার একটু গোছাইয়া নেয়। ভেজা চুলেই করে নেয় হাতখোঁপা। ছোঁয়াইবে না ছোঁয়াইবে করিয়াও একটু খানি বুলিয়া নেয় সিঁদুর। ক্ষয়াটে আলোয় আরেকবার চোখ বুলায় চারপাশে। প্লাস্টিকের সস্তা শাঁখা ঠোকাঠুকি খায়।

অপলা রাস্তায় নামে। বড়ো পিচ্ছিল বৃষ্টির জলে। রাত্রি তাহার পিছনে হাঁপানী রোগীর মতো শ্বাস টানে। অপলা পা দুটি টানিয়া লইয়া যায় আলপথ ধরিয়া। একসময় হারিয়ে যায় ওই সবুজের অন্ধকারে।

বান্ধবী- 반두비 (Ban-doo-bi); বাংলা নাম ও বাংলাদেশী অভিনেতার এ বছরের আলোচিত কোরিয়ান ছবি।



ছুটির দিনের অলস বিকেলে, দু'জন গিয়েছি এমন একটা ক্যাক্‌টাস কিনতে, যেটা সুর্যের আলোতে রাখার পর ছায়ায় নিয়ে আসলে রঙ বদলায়।
আজুসির(ত্রিশোর্ধ বা বিবাহিত পুরুষের জন্য সম্বোধন) হাতে নাম কোরিয়ন ভাষায় নাম লেখা কাগজটা ধরিয়ে দিলে- কিছুক্ষন উলটে পাল্টে দেখার পর নিয়ে গেলেন কোনার দিকে শেলফের কাছে। আমার পাশের জন গজগজ করছে-"এইসব আজগুবি জিনিষের নাম কে যে তো মার মাথায় ঢোকায়!"। পাশ থেকে আজুসি সাড়া দিলেন-

-বাংলাদেশী?
-আজুসী বাংলাদেশ আরায়ো?(আমার সঙ্গী বিরক্তি সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে জানতে চায়, আজুসি বাংলাদেশ চেনে কিনা)
-বাংলাদেশ আরায়ো, আরায়ো।(চিনি- চিনি, বাংলাদেশ চিনি)

বিদায় নেয়ার সময়, গামছা হামনিদা'র(অনেক ধন্যবাদ)সাথে মাথাটা এবার সঠিক পদ্ধতিতে নিচু করি বো করার জন্য।

আমার সহপাঠীদের বাংলাদেশ কোথায় বলতে গিয়ে ম্যাপ নিয়ে বসতে হয়েছিল। মাঝে মাঝে ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে লেকচার ঝাড়ি- বাংলাদেশ-ইন্দো(ইন্ডিয়া) এক নয়।
আমি বাংলাদেশী, শ্রীলংকা-ইন্দোনেশিয়া-ইন্ডিয়ার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
এর মাঝে কেউ যদি হঠাৎ চেহারা বা ভাষা শুনেই বলে ওঠে-
"ওহ! বাংলাদেশী ছারাম! বাংলাদেশ আরায়ো, আরায়ো"(ওহ তুমি বাংলাদেশী! চিনি, বাংলাদেশ চিনি!)
তখন গভীর রাতে লেকের পাড়ের নিঃসঙ্গ মৎস শিকারি মূহুর্তেই হয়ে উঠে আপনজন।

ইউনিভার্সিটির মেইন গেইট এর কাছে দুই চার্চ-কর্মী নিরন্তর ব্যস্ত লোকজন কে চার্চে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে- আমাকে দেখলেই আশপাশের লোকজনকে সচকিত করে গলা ছাড়ে স্পষ্ট বাংলায়- কালকে দেখা হবে- আমি তোমাকে ভালবাসি। দুই কোরিয়ান চার্চকর্মীর মুখে বাংলা শুনে সব দাত দেখিয়ে আমার প্রত্যুত্তর- আমিও তোমাকে ভালবাসি।

সু'র সাথে আগের তুলনায় ইংরেজী কম বলতে হয়- সে বাংলা বুঝে ওঠতে শুরু করেছে।
"কেমন আছো? আমার নাম 'হোয়াং দক সু'"
তখন আমার নোয়াখালির ছোটভাই সঠিক এবং শুদ্ধ বাংলায় প্রতিউত্তর দিতে বাধ্য হয়।

হু জং হুয়া যখন বারবার অস্থির ঘোষণা দিতে থাকে- "ক্ষিদা লাগছে- ক্ষিদা লাগছে" আমার ধারণা তখন আপনারাও ব্যস্ত হবেন ওকে কিছু একটা খাবার তৈরী করে দিতে।
বোমেনা-(বসন্তের প্রথম দিনে জন্মগ্রহনকারী) বিদায় নেয়ার পর, আমি অন্তত পাঁচ মিনিট পরপর একবার করে বলি- মেয়েটা অদ্ভুত রকমের ভালো! কারন আর কিছু নয়, সে চপস্টিক বা চামচ ছাড়া খালি হাতে দুই প্লেট ভাত মাখিয়ে খেয়েছে।



মূল কথার চেয়ে ভুমিকাই বেশি বড় হয়ে গেলো।
জুন ২৫, ২০০৯ তারিখে কোরিয়াতে একটি ছবি মুক্তি পেয়েছে, স্ক্রীনে কোরিয়ান এর পাশে বাংলাতেও যার নাম উঠেছে 'বান্ধবী'। ছবির শুরুই বাংলা সংলাপ দিয়ে- "কী বলছো তুমি? তিশা আমিও কষ্টে আছি-"



আমাদের চিটাগাং এর ছেলে ২৯ বছরের করিম কোরিয়ার কারখানায় কাজ করে ভাগ্য বদলাতে এসেছে। দেশে ফেরার সময় তার কাজের বকেয়া বেতন আদায়ের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে কারখানা মালিককে। আর সতের বছরের হাই স্কুল পড়ুয়া স্বাধীনচেতা জেদী মিন স্যু চরম বিদ্বেষী মায়ের এক কপর্দকশুন্য'র সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে। ঘটনাক্রমে করিম আর মিন স্যু'র পরিচয়, তার থেকে বন্ধুত্ব-ভাললাগা, ভালবাসা, যা শেষ পর্যন্ত পরিণতি লাভ করে না। অপরাধ না করেও করিম কে যেতে হয় জেলে। আর একেবারে শেষ দৃশ্যে মিন স্যু কে দেখা যায় বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্টে চিকেন কারী-ডাল দিয়ে হাত দিয়ে ভাত মাখিয়ে খাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে একা একা।
রেস্টুরেন্ট এর মালিকের প্রশ্নের জবাবে জানায়- চিংগু ইসসয়ো (বন্ধু আছে), না বান্ধবী (আমি বান্ধবী)।



ছবির অনেক জায়গাতেই বাংলা সংলাপ আছে। আছে অযু-নামাজের দৃশ্য, হাত দিয়ে বাংলা খাবার খাওয়া শেখানোর দৃশ্য। ছবি দেখার আগে বা দেখার পরে একটা জিনিষই আমাকে আহ্লাদিত এবং আপ্লুত করেছে যে ছবিটি বাংলাদেশী একটি চরিত্রকে ঘিরে তৈরি এবং তাতে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আমি এখানে ছবির ভাল মন্দ বিশ্লেষনে বসিনি, কিন্তু আপনারা যদি কখন দেখার সুযোগ পান তাহলে কয়েকটি এঙ্গেলেই বর্তমানে আলোচিত এই ছবিটিকে বিচার করা যায়- একজন হাইস্কুল পড়ুয়া ছাত্রী এবং একজন মাইগ্রেন্ট কর্মীর চোখে কোরিয়ান সমাজ, কোরিয়াতে মাইগ্রেন্ট কর্মীদের দুরাবস্থা, অপরিণত প্রেম, ক্ষোভ, বিদ্বেষ এবং হতাশা।



মুল বাংলাদেশী শ্রমিক এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন- এখানকার শর্টফিল্ম ডিরেক্টর মাহবুবুল আলম পল্লব। কৃতজ্ঞতা তার প্রতি এবং ছবির সাথে জড়িত সবার প্রতি।

তেলাপোকার জবানবন্দী

গত পরশুরাতে এক ঝাঁক তেলাপোকা আচমকাই আমার বিছানায় উড়ে এসে জুড়ে বসলো। এখানের ফোঁড়, ওখানের জংধরা সেফটিপিনের দূর্বল বাঁধ- সূক্ষ জাল মশারিকে নিশ্ছিদ্র করার ব্যর্থ প্রয়াস- আমার ঘরের সমস্ত কীটপতঙ্গের কাছে ক্রীতদাসের হাসির মতো। এই শ্রেনীর ভাষ্য অনুসারে আমি নাকি তাদের দারুনভাবে attract করি (খোদাই মালুম তা কিভাবে!)। তাই শুকনো খটখটে রাস্তায় এক কদম পিছিয়ে দু’কদম এগোলেই আমার জন্য কোনো কেঁচো ওৎ পেতে থাকবেই। একবিন্দু পরিমান লাল পিপড়েগুলি খেলতে খেলতে ঠিক আমার চোখের মনিতেই পড়বে। আর বেচারা আমি খেলায় বিঘ্ন দানকারী হিসেবে কুট্টুস কুট্টুস কামড় খেয়ে চোখ লাল করে ঘুরে বেড়াই।
আর ধরুন মশাই মশা। সমস্ত মশককূলের কাছে আমি নম্রুদের ছোটভাই। তাদের প্রতিনিধিরা প্রায়ই চেষ্টা করে আমার মুখগহবর দিয়ে ঢুকে নাসিকার ছিদ্র পথে বের হতে। আমার সাথে তাদের প্রিয় খেলা ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ’, ভোঁ ভোঁ দৌড়ে একবার ডানকানের ভেতর, কষে একটা থাপ্পড়ের শব্দে আবার বামকান- চলতে থাকে যতক্ষন না নিদ্রাদেবী দয়াপরবশত আমার শ্রান্তদেহ খানি তার বক্ষে টেনে নেয়।

কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি! সবই দোষ ভাই বয়সের দোষ! কথা বোঝাই মালগাড়ি আজকাল প্রায়ই দেখছি লাইন ছেড়ে খালি বে-লাইনে ছুটে যায়। একে তো জাইড়ার ট্রেন(লোকাল ট্রেন) তারপর যদি আবার কারও ঘাড়ে লাফিয়ে চড়ে- দেখেন্ত দেখি কেমন এক কান্ড হয়!

আহ! যা বলছিলাম! সেদিন রাত আনুমানিক দুই প্রহরে তেলাপোকার এক কমান্ডো বাহিনী তাদের শক্তিশালী পাখায় ভর করে আমার বিছানার বির বিক্রমে ল্যান্ড করে। সুশৃংখলভাবে সুস্থির হবার পর মাঝারী সাইজের গাট্টাগোট্টা একজন পেছনের আলখাল্লা দোলাতে দোলাতে গুটিগুটি পায়ে আমার নাকের ডগায় চেপে বসলো। (মাঝরাতে এ কী যন্ত্রণা!) বুড়ো ভাম দেখি আবার গলা পরিষ্কার করছে! মানুষের সাথে ঘর সংসার করতে করতে লেকচার ঝাড়ার প্রক্রিয়াও রপ্ত করে ফেলেছে নাকি! এই লেকচারের হাত থেকে আমি শেষ পর্যন্ত তেলাপোকার হাত থেকেও রেহাই পাবো না! অদ্ভুত কোনো কারনে সকল সময় সকল পদের মানুষ সেচ্ছাসেবক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে লেকচারের সহিত আমার মানসচক্ষু উন্মোচন করতে সদা ব্যস্ত। ‘এই শোন, এই শোনেন- তুমি কি আপনি কি এটা জানেন? বিষয়টা হচ্ছে এরকম যে, টিক-টিক-টিক... ।‘

হেথা হতে হোথা যাই, পুনর্বার পথ হারাই। তেলিনেতা’র (তেলাপোকাদের দলনেতা) সূচনাপর্বের সারমর্ম হচ্ছে উনারা তেলিদের (তেলাপোকাদের) বিষয়ে আমাকে মূল্যবান জ্ঞান্দান করতে চান। আমাকে এই বিশেষ সম্মান দানের কারন আর কিছুই না- তারা আমাকে পর্যবেক্ষন করে দেখেছে আমি অত্যন্ত আদর্শ একজন শ্রোতা। প্রয়োজনীয় discourse marker জায়গামতো সেট করে দিয়ে বক্তার বক্তব্য KTX(electric train) গতিতে চালিয়ে নিতে পূর্ণ সহযোগিতা করি।
বক্তব্য’র মাঝখানে বিটকেলে প্রশ্ন খাম্বার মতো গেঁড়ে দেই না। বা মান্দারের কাঁটা দিয়ে যুক্তির প্রাচির গড়ার অযথা চেষ্টা করি না। একজন সুচিন্তিত ব্যাক্তি (তেলিনেতার বক্তব্য অনুসারে) হিসেবে বক্তার বক্তব্যের সাথে আমি সবসময়ই ১০০% সহমত পোষন করি।
তাই তেলিরা একজন সহানুভূতি সম্পন্ন (তেলিনেতার মতে) শ্রোতার কাছে এসেছে তাদের কিছু মনোবেদনা জানাতে এবং তেলিসমাত্যের উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে। তাঁর ভাষাতেই আমি বলি না কেন-

“তোমরা আমাদের কীটদের মধ্যে শুদ্রশ্রেনীর বলে গন্য করো। অথচ বর্নবাদ ইস্যুতে ঠিকই গলা ফাটাও। মানুষের প্রাণ আছে বলে সে প্রাণী আমরা সাইজে যতো ছোটই হই না কেন প্রাণতো আমাদেরও আছে। আর প্রাণের পরিমাপ যেহেতু করা সম্ভব না, আতি আমাদের হেও করাও যুক্তিযুক্ত না। আমরা দুই গোত্রই যেহেতু প্রাণী সেহেতু প্রাণী অধিকার আমাদের সমান হওয়া উচিত। সেই অধিকার থেকে আমাদের সম্পূর্ণ রূপে বঞ্চিত করেই কেবল তমরা ক্ষান্ত হওনি বরং নিত্যনতুন insect killer- এর বিজ্ঞাপনে বাজার ভর্তি করে জান্তব ধংসযজ্ঞে নেমেছো। আত্মসম্মানবোধ এখনো অবশিষ্ট আছে বলে কুকুরের মতো বিশ্বস্ত প্রভুভক্ত এখনও হতে পারিনি হয়তো, তাই বলে ইঁদুর, মশামাছির মতো মহামারিওতো ঘটাই নি কখনো। (একটু থেমে)

তোমাদের ভয়ে আজ আমরা নির্বাসিত নিশাচর, অন্ধকারের পুজারী। মনুষ্যশ্রেনীতে নারিকূল আরো কয়েককাঠি বাড়া! কোনো ভদ্র তেলিলোক এদের সামনে পড়লে গরুর মতো চোখ দুটি বের করে দিয়ে ষাড়ের মতো চিল্লায়। এই হীন আচরন প্রতিনিয়ত যেন আমাদের আত্মমর্যাদার চাদর সোনামুখি সুঁই দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করছে। আর শিশুদিগের কথা কি বলবো! আমাদের দেখলেই শয়তানও তাদের পেছনে আঁঠার মতো সেঁটে যায়। একজনকে বাগে পেলেই উলটা করে ঝুলিয়ে দেয় কিম্বা আমাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করে- সেটা হলো চিত করে মাটিতে পেড়ে ফেলে। শূন্যে চার হাত-পা ছূড়েও মুক্তি মেলে না। এ কী বর্বর অকথ্য অত্যাচার নয় আমাদের উপর! আমাদের দাত নেই যে কামড়াবো, ধারাল নখ নেই যে থাবা বসাবো, কোনো শব্দ নেই যে ভনভন করে কানে জ্বালা ধরাবো, কোনো হুল নেই যা দিয়ে রক্ত টেনে নেবো, তবে কেন এত আক্রোশ আমাদের প্রতি!
প্রায়ই ডায়লগ ছাড়ো- ‘অতিকায় হস্তী লুপ্ত হইয়াছে তেলাপোকা টিকিয়া আছে’ একবার কি ভেবে দেখেছ কেন আমরা এখনো টিকে আছি? নিজেদের চারপাশে ভালো করে অবলোকন করো- বোকারাই দুঃসাহসী হয় আর অকারনে অযোক্তিক ভাবে অসময়ে ভুল জায়গায় সাহস প্রদর্শন করে অকালে বেঘোরে পটল তোলে- অতিকায় হস্তির কথা বলতে গিয়ে ‘সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট’ থিওরি’র কথা কিন্তু বেমালুম চেপে যাও। নিজেদের দিকে একবার তাকাও দেখি। পরিবার থেকে রাষ্ট্র- প্রাণের শুরু থেকে বিলীন হওয়া পর্যন্ত শুধু টিকে থাকার সংগ্রাম। বন্ধুদের আড্ডা থেকে অফিসের মিটিং- এই আমি আছি, টিকে আছি, আমারও অস্তিত্ব আছে- এই জানান দিতে দিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। নিজেদের মহাপ্রস্থান সযত্নে লালন করো- তুমি টিকে ছিলে এই চিহ্নটুকুর ছাপ অন্ততঃ যেন থাকে। বিবর্তনবাদের প্রায় শুরু থেকেই আমরা টিকে আছি, কারন টিকে থাকার ক্ষমতা আমাদের আছে, আর এই অস্তিত্ব, হোক না তোমাদের কাছে যতো হেয়, টিকিয়ে রাখাটাই প্রাণের সারকথা। ”

ফ্রাঞ্জ কাফকা’র ‘The Metamorphosis’ গলাধকরন করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। আমার দুর্বল পরিপাকতন্ত্র তা সহ্য করতে না পেরে গ্যাস দিয়ে বোঝাই করে ফেলেছে জায়গাটা। আমি নিশ্চিত এইসব নিছক এই গ্যাসেরই কারসাজি!

অভিশাপ

মেটে সবুজের দশহাতি গজ কাপড়টা লুঙ্গির মতো করে গিঁট দিতে দিতে, কালচে দাঁতালের ফাঁক ফোকর দিয়ে কয়েক দলা থুথু আর অশ্রাব্য গালির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে মফস্বলের তথাকথিত আবাসিক এলাকার সুস্থ দেহে খুঁচ-পাচড়ার মতো এই গলিটা, জটাধারী, সাক্ষাত-পেত্নী, লাইলী পাগলী দিনে কতবার পাক খায় তার কোনো হিসেব নেই।

রাস্তার দুই ধারের নালার ধার থেকে বৎসরে ক্রমহারে বর্ধমান ছানার পাল হলুদ সরু, মাঝারি, মোটা দড়ি নিচের থকথকে পাকে নামিয়ে দিতে দিতে সমস্বরে গলা ফাটায়-“হেঁ! হেঁ! হেঁ! লাইলী পাগলী! লাইলী পাগলী!”। আর লাইলী তার অশ্রবনযোগ্য শব্দের ভান্ডার উজার করতে করতে ডানপাশের মরা চিমসানো বুক উদাম রেখে আঁচল লেছড়ে নিয়ে মাতালের মতো রাস্তার এধার ওধার করত করতে যায়।

গলির শেষ মাথার মুদি দোকানের বেঞ্চ থেকে খ্যাঁক খ্যাঁক হাসির সাথে ডাক আসে, “লাইলী, গুল নিবিনে, গুল?”
লাইলীর বিড়বিড় থামে, “তারা বাই, দ্যাও না, ইট্টু গুল দ্যাও”
তারা ভাই গেঞ্জিটা টেনে বুকের উপর তুলে দিয়ে, লুঙ্গিটা ভুড়ির নিচে কষে দুইটা প্যাঁচ দিতে দিতে গর্জায়,”রমজান, মাগীর বায়না দেখছনি! সব খাইয়া শ্যাষ কইর্যা মা’ডারেও খাইতাছে, তার পরওনি শালীর খাওন কমে!”

লাইলীর মা- কারো দাদী, কারো ফুফু, চার পাঁচ বাড়ী তার কালচে বেগুনী হয়ে যাওয়া হাতে বাসন মাজে, ঘর ধুয়ে দেয়। লাইলীর মা’র বাসন মাজা পাড়া বিখ্যাত। খড়ি-কাঠের ছাই দিয়ে অ্যালুমিনিয়াম আর তেঁতুল দিয়ে কাঁসা এমন আর কেউ ঝকঝকে করতে পারে না।
লাইলীও দুদন্ড টিকতে দেয় না ঘরে; “ও মা, মা! যাইতিনা আইজকা বড় বাড়িত্? ও মা, মা! খিদা লাগছে! ও মা, মা! বাত দে!”
তাই মাঘের শীতেও ভোর ভোর ন্যাতানো এক চাদরে তপ্ত গায়ে আরেক বাড়ির উনুনে আগুন দিতে যেতে হয়। কর্ত্রীদের তরল-গরল সহানুভূতির সাথে কিছু ঝামটাও শোনা যায়, “আহ্হারে বুড়া মা’ডারে ইট্টু শান্তি দিলো না! পাগলীর খাই কমে না!”
অ্যালুমিনিয়াম এর হাঁড়ি খড়ের মাজুনির তীব্র কয়টা ঘষা খেয়ে ক্যান ক্যান করে ওঠে।
“হারামজাদী, বাপরে খাইছছ্, মাইয়াডারে দূর করছছ্ অহন আমারেও শ্যাষ করবার লাগছছ্”

বইপত্রে অনেক ডিটেইল করার প্রয়োজন হয় গল্পের স্বার্থে কিম্বা হতে পারে সময় একটা প্রথা তৈরী করেছে মাত্র। যেমন- কেচ্ছা কাহিনীর শুরুই হয়- “এক যে ছিলো রাজা, তাঁর ছিলো দুই রানী...”। বাস্তব যে গল্পের জন্ম দেয় তার এত ডিটেইল থাকে না, আবার এমনও হয়, কল্পরাজ্যকেও হার মানায় এর বিস্তার।

লাইলীর স্বামীর ব্যাপারে পাড়ার তথ্যকোষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ওর বাপের রক্ষীবাহিনীর চেলা হওয়ার সাধ যে মিটিয়ে দিয়েছিলো সিরাজ শিকদার এর দল, তা বেশ ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলা আছে।
জনশ্রুতি বলে, লাইলী একটা অভিশাপ। “বাপডা গরের মইদ্যে পইচ্যা মরছে, ব্যাদনায় চিল্লাইছে, মাইয়াডা গিন্নায় থুথু ফালাইছে”।

লাইলী কোনোদিন হাড়-মাংসের মানুষ ছিলো কি?

হেলতে দুলতে যখন গলির এপাড় ওপাড়, এবাড়ি ওবাড়ির ঘুপচি, পেছনের ডোবা, পাড়ার একমাত্র মাঠ- দিনে চল্লিশবার পাক কাটে তখন চিতা থেকে উঠে আসা, পিশাচিনী ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
দাওয়া অথবা কোনো বারান্দা থেকে হঠাৎ কেউ খেঁকিয়ে ওঠে, ”মাইয়াডা, একটা কসাই, নইলে নিজের প্যাডের সন্তানরে কেউ বেইচ্যা দেয়!”

লাইলীর কোনো ভাবান্তর নাই। হেলতে দুলতে হাঁটে, পিচিক পিচিক থুথু ফেলে, ক্ষেপে গেলে গালির বন্যা বইয়ে দেয়। মাঝে মাঝে কারো পাক ঘরের সামনে দাঁড়ায়, কালচে দাঁত, কালচে মাড়িগুলি দেখিয়ে শুধায়, “ও রুকী বাবী দুইডা গরম বাত খাওয়াইবাইন?”

কখনো বা খেয়ালের বশে, একতাল কাদা নিয়ে পাখ-পাখালি, জন্তু-জানোয়ার, ফুল-গাছ-লতাপাতা গড়তে বসে। ছেলেপিলে লোভ সামলাতে না পেরে, পায়ে পায়ে এগোয়, মুগ্ধ নয়নে দেখে- আঙুলের কয়েকটা মিহি চাপে কেমন দাঁড়িয়ে গেল একটা ফুলগাছ।
-“ও লাইলী পাগলী, আমারে একটা দিবা?”
-“না, না, খবরদার দরবি না, এডি সব সপ্না’র লাইগ্যা। সপ্না কাইলকা আইবো, সব আমার সপ্নার লাইগ্যা”।

(আমার দুই সন্তানসম চার্লস এবং বাবো ছেড়ে চলে গেছে, কোথায় আছে কেমন আছে জানি না। তাদের স্মরণ করছি, ব্যাথা এবং ভালবাসায়।)