Friday, July 23, 2010

বান্ধবী- 반두비 (Ban-doo-bi); বাংলা নাম ও বাংলাদেশী অভিনেতার এ বছরের আলোচিত কোরিয়ান ছবি।



ছুটির দিনের অলস বিকেলে, দু'জন গিয়েছি এমন একটা ক্যাক্‌টাস কিনতে, যেটা সুর্যের আলোতে রাখার পর ছায়ায় নিয়ে আসলে রঙ বদলায়।
আজুসির(ত্রিশোর্ধ বা বিবাহিত পুরুষের জন্য সম্বোধন) হাতে নাম কোরিয়ন ভাষায় নাম লেখা কাগজটা ধরিয়ে দিলে- কিছুক্ষন উলটে পাল্টে দেখার পর নিয়ে গেলেন কোনার দিকে শেলফের কাছে। আমার পাশের জন গজগজ করছে-"এইসব আজগুবি জিনিষের নাম কে যে তো মার মাথায় ঢোকায়!"। পাশ থেকে আজুসি সাড়া দিলেন-

-বাংলাদেশী?
-আজুসী বাংলাদেশ আরায়ো?(আমার সঙ্গী বিরক্তি সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে জানতে চায়, আজুসি বাংলাদেশ চেনে কিনা)
-বাংলাদেশ আরায়ো, আরায়ো।(চিনি- চিনি, বাংলাদেশ চিনি)

বিদায় নেয়ার সময়, গামছা হামনিদা'র(অনেক ধন্যবাদ)সাথে মাথাটা এবার সঠিক পদ্ধতিতে নিচু করি বো করার জন্য।

আমার সহপাঠীদের বাংলাদেশ কোথায় বলতে গিয়ে ম্যাপ নিয়ে বসতে হয়েছিল। মাঝে মাঝে ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে লেকচার ঝাড়ি- বাংলাদেশ-ইন্দো(ইন্ডিয়া) এক নয়।
আমি বাংলাদেশী, শ্রীলংকা-ইন্দোনেশিয়া-ইন্ডিয়ার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
এর মাঝে কেউ যদি হঠাৎ চেহারা বা ভাষা শুনেই বলে ওঠে-
"ওহ! বাংলাদেশী ছারাম! বাংলাদেশ আরায়ো, আরায়ো"(ওহ তুমি বাংলাদেশী! চিনি, বাংলাদেশ চিনি!)
তখন গভীর রাতে লেকের পাড়ের নিঃসঙ্গ মৎস শিকারি মূহুর্তেই হয়ে উঠে আপনজন।

ইউনিভার্সিটির মেইন গেইট এর কাছে দুই চার্চ-কর্মী নিরন্তর ব্যস্ত লোকজন কে চার্চে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে- আমাকে দেখলেই আশপাশের লোকজনকে সচকিত করে গলা ছাড়ে স্পষ্ট বাংলায়- কালকে দেখা হবে- আমি তোমাকে ভালবাসি। দুই কোরিয়ান চার্চকর্মীর মুখে বাংলা শুনে সব দাত দেখিয়ে আমার প্রত্যুত্তর- আমিও তোমাকে ভালবাসি।

সু'র সাথে আগের তুলনায় ইংরেজী কম বলতে হয়- সে বাংলা বুঝে ওঠতে শুরু করেছে।
"কেমন আছো? আমার নাম 'হোয়াং দক সু'"
তখন আমার নোয়াখালির ছোটভাই সঠিক এবং শুদ্ধ বাংলায় প্রতিউত্তর দিতে বাধ্য হয়।

হু জং হুয়া যখন বারবার অস্থির ঘোষণা দিতে থাকে- "ক্ষিদা লাগছে- ক্ষিদা লাগছে" আমার ধারণা তখন আপনারাও ব্যস্ত হবেন ওকে কিছু একটা খাবার তৈরী করে দিতে।
বোমেনা-(বসন্তের প্রথম দিনে জন্মগ্রহনকারী) বিদায় নেয়ার পর, আমি অন্তত পাঁচ মিনিট পরপর একবার করে বলি- মেয়েটা অদ্ভুত রকমের ভালো! কারন আর কিছু নয়, সে চপস্টিক বা চামচ ছাড়া খালি হাতে দুই প্লেট ভাত মাখিয়ে খেয়েছে।



মূল কথার চেয়ে ভুমিকাই বেশি বড় হয়ে গেলো।
জুন ২৫, ২০০৯ তারিখে কোরিয়াতে একটি ছবি মুক্তি পেয়েছে, স্ক্রীনে কোরিয়ান এর পাশে বাংলাতেও যার নাম উঠেছে 'বান্ধবী'। ছবির শুরুই বাংলা সংলাপ দিয়ে- "কী বলছো তুমি? তিশা আমিও কষ্টে আছি-"



আমাদের চিটাগাং এর ছেলে ২৯ বছরের করিম কোরিয়ার কারখানায় কাজ করে ভাগ্য বদলাতে এসেছে। দেশে ফেরার সময় তার কাজের বকেয়া বেতন আদায়ের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে কারখানা মালিককে। আর সতের বছরের হাই স্কুল পড়ুয়া স্বাধীনচেতা জেদী মিন স্যু চরম বিদ্বেষী মায়ের এক কপর্দকশুন্য'র সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে। ঘটনাক্রমে করিম আর মিন স্যু'র পরিচয়, তার থেকে বন্ধুত্ব-ভাললাগা, ভালবাসা, যা শেষ পর্যন্ত পরিণতি লাভ করে না। অপরাধ না করেও করিম কে যেতে হয় জেলে। আর একেবারে শেষ দৃশ্যে মিন স্যু কে দেখা যায় বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্টে চিকেন কারী-ডাল দিয়ে হাত দিয়ে ভাত মাখিয়ে খাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে একা একা।
রেস্টুরেন্ট এর মালিকের প্রশ্নের জবাবে জানায়- চিংগু ইসসয়ো (বন্ধু আছে), না বান্ধবী (আমি বান্ধবী)।



ছবির অনেক জায়গাতেই বাংলা সংলাপ আছে। আছে অযু-নামাজের দৃশ্য, হাত দিয়ে বাংলা খাবার খাওয়া শেখানোর দৃশ্য। ছবি দেখার আগে বা দেখার পরে একটা জিনিষই আমাকে আহ্লাদিত এবং আপ্লুত করেছে যে ছবিটি বাংলাদেশী একটি চরিত্রকে ঘিরে তৈরি এবং তাতে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আমি এখানে ছবির ভাল মন্দ বিশ্লেষনে বসিনি, কিন্তু আপনারা যদি কখন দেখার সুযোগ পান তাহলে কয়েকটি এঙ্গেলেই বর্তমানে আলোচিত এই ছবিটিকে বিচার করা যায়- একজন হাইস্কুল পড়ুয়া ছাত্রী এবং একজন মাইগ্রেন্ট কর্মীর চোখে কোরিয়ান সমাজ, কোরিয়াতে মাইগ্রেন্ট কর্মীদের দুরাবস্থা, অপরিণত প্রেম, ক্ষোভ, বিদ্বেষ এবং হতাশা।



মুল বাংলাদেশী শ্রমিক এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন- এখানকার শর্টফিল্ম ডিরেক্টর মাহবুবুল আলম পল্লব। কৃতজ্ঞতা তার প্রতি এবং ছবির সাথে জড়িত সবার প্রতি।

No comments:

Post a Comment