Friday, July 23, 2010

অভিশাপ

মেটে সবুজের দশহাতি গজ কাপড়টা লুঙ্গির মতো করে গিঁট দিতে দিতে, কালচে দাঁতালের ফাঁক ফোকর দিয়ে কয়েক দলা থুথু আর অশ্রাব্য গালির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে মফস্বলের তথাকথিত আবাসিক এলাকার সুস্থ দেহে খুঁচ-পাচড়ার মতো এই গলিটা, জটাধারী, সাক্ষাত-পেত্নী, লাইলী পাগলী দিনে কতবার পাক খায় তার কোনো হিসেব নেই।

রাস্তার দুই ধারের নালার ধার থেকে বৎসরে ক্রমহারে বর্ধমান ছানার পাল হলুদ সরু, মাঝারি, মোটা দড়ি নিচের থকথকে পাকে নামিয়ে দিতে দিতে সমস্বরে গলা ফাটায়-“হেঁ! হেঁ! হেঁ! লাইলী পাগলী! লাইলী পাগলী!”। আর লাইলী তার অশ্রবনযোগ্য শব্দের ভান্ডার উজার করতে করতে ডানপাশের মরা চিমসানো বুক উদাম রেখে আঁচল লেছড়ে নিয়ে মাতালের মতো রাস্তার এধার ওধার করত করতে যায়।

গলির শেষ মাথার মুদি দোকানের বেঞ্চ থেকে খ্যাঁক খ্যাঁক হাসির সাথে ডাক আসে, “লাইলী, গুল নিবিনে, গুল?”
লাইলীর বিড়বিড় থামে, “তারা বাই, দ্যাও না, ইট্টু গুল দ্যাও”
তারা ভাই গেঞ্জিটা টেনে বুকের উপর তুলে দিয়ে, লুঙ্গিটা ভুড়ির নিচে কষে দুইটা প্যাঁচ দিতে দিতে গর্জায়,”রমজান, মাগীর বায়না দেখছনি! সব খাইয়া শ্যাষ কইর্যা মা’ডারেও খাইতাছে, তার পরওনি শালীর খাওন কমে!”

লাইলীর মা- কারো দাদী, কারো ফুফু, চার পাঁচ বাড়ী তার কালচে বেগুনী হয়ে যাওয়া হাতে বাসন মাজে, ঘর ধুয়ে দেয়। লাইলীর মা’র বাসন মাজা পাড়া বিখ্যাত। খড়ি-কাঠের ছাই দিয়ে অ্যালুমিনিয়াম আর তেঁতুল দিয়ে কাঁসা এমন আর কেউ ঝকঝকে করতে পারে না।
লাইলীও দুদন্ড টিকতে দেয় না ঘরে; “ও মা, মা! যাইতিনা আইজকা বড় বাড়িত্? ও মা, মা! খিদা লাগছে! ও মা, মা! বাত দে!”
তাই মাঘের শীতেও ভোর ভোর ন্যাতানো এক চাদরে তপ্ত গায়ে আরেক বাড়ির উনুনে আগুন দিতে যেতে হয়। কর্ত্রীদের তরল-গরল সহানুভূতির সাথে কিছু ঝামটাও শোনা যায়, “আহ্হারে বুড়া মা’ডারে ইট্টু শান্তি দিলো না! পাগলীর খাই কমে না!”
অ্যালুমিনিয়াম এর হাঁড়ি খড়ের মাজুনির তীব্র কয়টা ঘষা খেয়ে ক্যান ক্যান করে ওঠে।
“হারামজাদী, বাপরে খাইছছ্, মাইয়াডারে দূর করছছ্ অহন আমারেও শ্যাষ করবার লাগছছ্”

বইপত্রে অনেক ডিটেইল করার প্রয়োজন হয় গল্পের স্বার্থে কিম্বা হতে পারে সময় একটা প্রথা তৈরী করেছে মাত্র। যেমন- কেচ্ছা কাহিনীর শুরুই হয়- “এক যে ছিলো রাজা, তাঁর ছিলো দুই রানী...”। বাস্তব যে গল্পের জন্ম দেয় তার এত ডিটেইল থাকে না, আবার এমনও হয়, কল্পরাজ্যকেও হার মানায় এর বিস্তার।

লাইলীর স্বামীর ব্যাপারে পাড়ার তথ্যকোষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ওর বাপের রক্ষীবাহিনীর চেলা হওয়ার সাধ যে মিটিয়ে দিয়েছিলো সিরাজ শিকদার এর দল, তা বেশ ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলা আছে।
জনশ্রুতি বলে, লাইলী একটা অভিশাপ। “বাপডা গরের মইদ্যে পইচ্যা মরছে, ব্যাদনায় চিল্লাইছে, মাইয়াডা গিন্নায় থুথু ফালাইছে”।

লাইলী কোনোদিন হাড়-মাংসের মানুষ ছিলো কি?

হেলতে দুলতে যখন গলির এপাড় ওপাড়, এবাড়ি ওবাড়ির ঘুপচি, পেছনের ডোবা, পাড়ার একমাত্র মাঠ- দিনে চল্লিশবার পাক কাটে তখন চিতা থেকে উঠে আসা, পিশাচিনী ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
দাওয়া অথবা কোনো বারান্দা থেকে হঠাৎ কেউ খেঁকিয়ে ওঠে, ”মাইয়াডা, একটা কসাই, নইলে নিজের প্যাডের সন্তানরে কেউ বেইচ্যা দেয়!”

লাইলীর কোনো ভাবান্তর নাই। হেলতে দুলতে হাঁটে, পিচিক পিচিক থুথু ফেলে, ক্ষেপে গেলে গালির বন্যা বইয়ে দেয়। মাঝে মাঝে কারো পাক ঘরের সামনে দাঁড়ায়, কালচে দাঁত, কালচে মাড়িগুলি দেখিয়ে শুধায়, “ও রুকী বাবী দুইডা গরম বাত খাওয়াইবাইন?”

কখনো বা খেয়ালের বশে, একতাল কাদা নিয়ে পাখ-পাখালি, জন্তু-জানোয়ার, ফুল-গাছ-লতাপাতা গড়তে বসে। ছেলেপিলে লোভ সামলাতে না পেরে, পায়ে পায়ে এগোয়, মুগ্ধ নয়নে দেখে- আঙুলের কয়েকটা মিহি চাপে কেমন দাঁড়িয়ে গেল একটা ফুলগাছ।
-“ও লাইলী পাগলী, আমারে একটা দিবা?”
-“না, না, খবরদার দরবি না, এডি সব সপ্না’র লাইগ্যা। সপ্না কাইলকা আইবো, সব আমার সপ্নার লাইগ্যা”।

(আমার দুই সন্তানসম চার্লস এবং বাবো ছেড়ে চলে গেছে, কোথায় আছে কেমন আছে জানি না। তাদের স্মরণ করছি, ব্যাথা এবং ভালবাসায়।)

No comments:

Post a Comment